মেনু নির্বাচন করুন
গল্প নয় সত্যি

সংবিধিবন্ধ সতর্কীকরনঃ এখানে প্রবাসের কথা এক ফোঁটাও নাই, সবই দেশের কথা।

বিদেশ যাত্রার আগের কয়েক মাস
জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বুয়েট থেকে বের হয়ে একটু দ্বিধাদ্বন্ধে পড়ে গেলাম। কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি কাল থেকে GRE পড়া শুরু করবো...আগামী বছর বুশ মামার দেশে যাবো। সকালে উঠে আবার ভাবি ধুর…দেশেই থাকবো কি দরকার এত্তোসব ঝামেলায় যাবার। মনের মাধুরি মিশিয়ে সিভি বানাতে শুরু করি, বিডিজবসের আনাচে কানাচে ঘুরাঘুরি করে ডিপার্টমেন্টের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করি। এদিকে ওন্টারিও থেকে সুধনদা আর শর্মিষ্ঠাদি [এই দুজন মানুষের কাছে অনেক কৃতজ্ঞতা] বলেন তোমার বাইরে আসার কি হলো। শর্মিষ্ঠাদি ফোন ধরলে প্রথম কথা, বিপ্র কানাডায় কবে আসছো? মনে হয় আমার সব ঠিকঠাক…শুধু উড়াল দিবার অপেক্ষা। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না কি করবো…চাকরি না GRE… নাকি MBA করে ব্যাংকে-ট্যাংকে ঢুকার চেষ্টা করবো।

কানাডার বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন এপ্লিকেশন ডেডলাইন প্রায় শেষের পথে। তবুও বিভিন্ন ভার্সিটির প্রফেসরকে মেইল করতে থাকি। সবার একই উত্তর…এখন ফান্ড নাই… অন্য কোথাও দেখো…গুডলাক। শেষ পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব রেজিনার এক ম্যাডামকে মেইল করলাম। উত্তর এলো…বিপ্র, তোমার ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠাও। একদিন দুইদিন যায়, উত্তর আসে না। অবশেষে তিনদিন পর উত্তর এলো, অন্য ডিপার্টমেন্টে আমার কলিগের আন্ডারে তোমাকে নেয়া হবে…তাড়াতাড়ি এপ্লাই করো। তখনও ট্রান্সক্রিপ্ট সহ হাতে বুয়েটের কাগজপত্র নাই। স্যান্ডেল ক্ষয় করতে করতে সব কাগজ হাতে আসলো ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে। কাগজপত্র পাঠিয়ে অপেক্ষায় বসে থাকি।

মার্চের শেষ সপ্তাহের দিকে একদিন চট্টগ্রাম থেকে নুভান ফোন দিল, দোস্ত আমাদের ঢাকা প্লান্টের জন্য ওয়াক-ইন-ইন্টারভিউ হবে। ভাইভা দে…কয়েক মাস করে দেখতে পারিস…একটা অভিজ্ঞতা তো হবে। ভাইভার জন্য সিভি নিয়ে হাজির হলাম। দেখি ক্লাসের প্রায় সব পোলাপান চলে আসছে। এদের অনেকে আবার অন্য কোথাও জয়েন করেছে। হাজির হলাম বেলা দুইটায়। সবার ভাইভা প্রায় ২০/২৫ মিনিট ধরে নিচ্ছে। আমার ডাক পড়লো সন্ধ্যায় ৬টার দিকে। এই দুই মাসে সব ভুলে গেছি। দুইটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। উত্তর দিলাম…মনে নাই…তবে আমি কুইক লার্নার। আমার খুব আগ্রহ প্রসেস ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার। এইজন্যই কেমিক্যাল পড়ছি (?)…ইত্যাদি। মনে মনে বলছি, পাগলা কুত্তায় কামড়াইছিলো বলে ক্যামিকেল নিছিলাম। যাই হোক, ভাইভা বোর্ডের দুইজন মোটামুটি আমার ভাবসাবে সন্তুষ্ট মনে হলো। বললেন খুব শিঘ্রই জানাবেন। পরদিন সকালে উঠে বাজারের ব্যাগ হাতে টাউন হল বাজার থেকে মেসে ফিরছি। মাঝপথে ফোন এলো…ঢাকা প্লান্টে না ওদের চট্টগ্রাম প্লান্টে জয়েন করতে হবে। ওখানে নুভান, অনি আর শিহাব ইতোমধ্যে জয়েন করেছে। ঠিক করতে পারছি না কি করবো। সকালে ভাবি জয়েন করবো। বিকেলে ভাবি ঢাকা ছাড়া ঠিক হবে না।এদিকে নুভান চাপাচাপি শুরু করলো, দোস্ত আইয়া পড়…পুরা হলের মতো মজা হবে। সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। শেষ পর্যন্ত জয়েন না করার সিদ্ধান্ত নিলাম।জয়েন করার তারিখ ১ এপ্রিল। আগের দিন…দুপুর একটা। নুভান ফোন দিল…তুই যে জয়েন করবি না এইটা ওদের জানানো উচিত। হঠাৎ ভাবলাম…ধুর আবার যদি কানাডা না যাইতে পারি শুধু ৬ মাস ঘরে বসে থেকে কি লাভ। বাসায় আলাপ করে দুপুর দুইটায় সিদ্ধান্ত নিলাম চট্টগ্রাম যাবো। বাক্স-পেটরা সব বেঁধে রওয়ানা দিলাম তিনটার বাসে।সন্ধ্যায় আমি ডিম আর পরোটা দিয়া কুমিল্লার অফবিট রেস্টুরেন্টে নাস্তা করছি। এমন সময় মেস থেকে মিথুনের ফোন এলো, কিরে তুই কই? আমি বললাম, দোস্ত আমি চিটাগাং যাই…কাল জয়েন করতাছি। ও মনে হলো আকাশ থেকে পড়লো! কোনমতে বললো, ও আচ্ছা…। চট্টগ্রামে পৌছালাম অনেক রাতে। পরদিন আমার সাথে আরেকজন জয়েন করলো। প্লান্টের নতুন ডিজিএম…অবসর প্রাপ্ত জলপাই।তার বিশাল গোঁফ…যেন মুখের সামনে বিরাট এক মাকড়সা ঘাপটি মেরে বসে আছে।

প্লান্টের ভেতরেই রেস্ট হাউজ। আমরা একই ব্যাচের চারজন রীতিমতো হল বানিয়ে ফেললাম রেষ্ট হাউসকে। ফুল ভলিউমে গান শুনি…আড্ডা দেই। ব্রাউজ করি। কন্ট্রোল রুমেরও হালও প্রায় আমরা একই করে ফেলেছি। রাতের শিফটে ielts এর বই, ল্যাপটপ নিয়ে যাই। মাঝে মধ্যে ভালো না লাগলে সিনেমা দেখি, ব্রাউজ করি। আমার গ্রুপটাও মজার। শিহাব আর রাশেদ ভাই…প্লান্টে ঝামেলা না থাকলে রাশেদ ভাই খেয়ে দেয়ে ঘুম দেন…এক ঘুমে সকাল ছয়টা। শিহাব মাঝে মধ্যে আমাকে আরোও ফাঁকি দেয়ার সুযোগ করে দেয়। আর সাথে একটা সাউথ ইন্ডিয়ান থাকে। এই প্লান্টে সাউথ ইন্ডিয়ান চারটা।এর মাঝে দুইটা খুবই বদমাইশ টাইপের।একজনের নাম বেলায়দম। বয়স ৫৫ এর মতো। তার চরিত্রে কিঞ্চিত ‘ইয়ে’ আছে। সে মিলা এবং শিরিণের বিরাট ভক্ত। তার মতে শিরিনের গলা পুরুষ এবং মহিলার মাঝামাঝি এবং সেই কারনেই হেভি সেক্সি। একদিন সে আমাদের কলিগ ফরহাদ ভাইকে বললো, আচ্ছা ফরহাদজী, হিন্দিতে যেরকম আইটেম সং-এর ভিডিও আছে, বাংলায় নাই? ফরহাদ ভাই বত্রিশটা দাঁত বের করে বললেন, আছে তো…থাকবে না ক্যান।দোকানে গিয়া বলবা, কাটপিস দাও…তাইলেই দিবে। বেলায়দম গভীর মনযোগে একটা কাগজে টুকে নিলো ‘কাটপিস’।দু’চারদিন পর বেলায়দম কন্ট্রোল রুমে…মুখ হাঁড়ি বানিয়ে বসে আছে। সানমার শপিং সেন্টারে ‘কাটপিস’ খুঁজতে গিয়ে এক দোকানে ঝাঁড়ি খেয়েছে…ওকে বলেছে ফুটপাতে গিয়ে খুঁজতে।

এর মাঝে জলপাই ডিজিএম বিরাট ঝামেলা শুরু করেছিল। উপস্থিতির খাতায় সাইন আগে করছো অথবা কেন করো নাই। অফিসার্স মেসে হাত দিয়া খাও ক্যান…চামচ দিয়া খাও…ইঞ্জিনিয়ারদের সবকিছুতেই তার সমস্যা। আমারে একদিন ডাক দিল, ৬ তারিখের সাইন আজকে করছো কেন? আমি আকাশ থেকে পড়লাম,কি কন? আজকে ৬ তারিখ না??? নিজের অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ হলাম নিজেই।জলপাই বেচারার মুখের অবস্থা তখন দেখার মতো। মুখ শক্ত করে বললো, এখন থেকে খাতার পাশে ক্যালেন্ডার রাখা হবে।

আমি যে কদিন কাজ করেছি, তার মাঝে সুইডেন থেকে প্রসেস ডিজাইনার এরিখ এলেন।তিনি রেষ্ট হাউসেই থাকেন। রাতে ডিনার শেষে আমার আর নুভানের সাথে তার অনেক আড্ডা হয়। নুভান কথায় কথায় উইকিপিডিয়ার রেফারেন্স দেয়। এরিখ স্যার নুভানের এই উইকি প্রতিভায় রীতিমতো মুগ্ধ।

এইসব নানান ফালতু ঝামেলার মাঝে IELTS দিয়ে স্কোর পাঠিয়ে দিলাম। আমার সুপারভাইজার আবার মেইল দিলেন, তার জরুরী ভিত্তিতে আরোও একজন স্টুডেন্ট দরকার। নুভান ইতোমধ্যে কোরিয়াতে কনফার্ম করেছে। তাই অনি এপ্লাই করলো। দু’জনেই ফান্ডিং পেলাম সেপ্টেম্বর থেকে। আমাদের মাঝে সবার প্রথমে আমি চাকুরি ছাড়লাম। প্রজেক্ট ম্যানেজার মি.রাও রাগে লাফালফি শুরু করলো্,অনেক কথা কাটাকাটি হলো। জলপাইটা প্যাঁচাতে লাগলো। কেন চাকুরি ছাড়বা, না হয় ঢাকা প্লান্টে জয়েন করো… নাকি অন্য কোথায় জয়েন করবা…। শেষ পর্যন্ত রিলিজ লেটার পেলাম না। অবশ্য কানাডা আসার আগে রিলিজ লেটার এবং অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট পেয়েছিলাম…ওখানের বুয়েটের এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে।

ভিসার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে রীতিমতো ভয়াবহ অবস্থা হলো।কানাডার ভিসায় চৌদ্দগুষ্টির কাগজপত্র লাগে। প্রত্যেকটা কাগজ তুলতেই গাদাখানেক টাকা গেলো। জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট তুললাম মোট তিনবার। প্রথমবার বাংলা ফর্মে ইংরেজিতে সব দিলো। পরের বার সব ঠিক আছে শুধু সেক্সের জায়গায় ফিমেল! … আরোও টাকা দিয়ে নিজে গিয়ে নিয়ে আসলাম সিটি কর্পোরেশন থেকে। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ভিসা পেলাম আগষ্টের ৫ তারিখ। কিন্তু অনির ভিসা তখনও হয়নি।

রেজিনাতে বাংলাদেশের কাউকে পাইনা। বাসার ব্যবস্থা করতে পারছি না…ডর্মেও সিট ফাঁকা নাই। শেষ পর্যন্ত অনেকটা ভূত থেকে ভূতে পদ্ধতিতে পরিচয় হলো বুয়েটের মিসবাহ ভাইয়ের সাথে, এখন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক…সিলেটেই বাড়ি। তিনিও আমাদের সাথেই এবার মাস্টার্স শুরু করবেন রেজিনাতে, আপাতত থাকেন বুয়েটের আরেক বড় ভাইয়ের সাথে। তিনিই শেষ পর্যন্ত একটা এপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিছু চিন্তা কমলো।

শপিংয়ে সচলায়তনে দেয়া কিংকংয়ের লিস্টটা দারূণ কাজে দিলো। একই পোস্টে প্রবাসী সচলদের পরমার্শ অনুযায়ী একটি বদনাও নেয়া হলো। আমার সহযাত্রী অনি ভিসা পেল ২০ আগষ্ট। কোন এয়ারওয়েজে টিকেট নাই। শেষ মুহূর্তে কুয়েত এয়ারওয়েজের টিকেট কাটা হলো প্রায় হাজার দশেক টাকা গচ্ছা দিয়ে। ফ্লাইট ২৫ তারিখ ভোরে। ডলার এনড্রোজ করতে গিয়ে আরেক মহাঝামেলায় পড়লাম। স্টুডেন্ট ভিসায় ব্যাংক ছাড়া ডলার এনড্রোজ করা যায় না, তাও সর্বোচ্চ ২০০ ডলার । ফান্ডিং পেলে স্টুডেন্ট ফাইল খোলাও নাকি সম্ভব না। সবশেষে অনেক ঝামেলা শেষে ফ্লাইটের একদিন আগে ছুটির দিনে এক পরিচিত মানি একচেঞ্জ থেকে এক হাজার ডলার এনড্রোজ করালাম…বাকী ডলার কাপড়ের চিপায় চাপায়।শেষ কয়েকটা দিন বাসায় কিভাবে কেটে গেলো টের পেলাম না। ফ্লাইটের দুইদিন আগে ঢাকায় আসলাম।সেদিন বিকেলে বুয়েটে অনেকের সাথে দেখা হলো। ব্যাচের একদল পোলাপান ক্যাম্পাসে…কয়েকজনের সেদিন রাতেই ফ্লাইট…জার্মানি আর সুইডেনে। সন্ধ্যায় বুয়েট থেকে ফেরার পথে কেমন শূণ্যতা অনুভব করলাম। মনে হলো…হাত বাড়ালেই আর এই হাতে হাত রাখবে না কোন নৌফেল, তপু কিংবা নুভান। নুভান কোরিয়া চলে গেছে ১৮ তারিখেই, তপু আইবিএ তে। ওর কাল এসাইনমেন্ট, আসতে পারেনি। মেসে ফিরলাম…সাথে বরাবরের মতো নিজের ব্যাপারে উদাসীন নৌফেল। তখন লোডশেডিং… বারান্দায় সবাই সিগারেট ফুঁকছে…। অভ্যাস না থাকা স্বত্বেও দু’একটা টান দিলাম। চোখে ভাসছে বুয়েটের গত পাঁচটা বছর। লোডশেডিংয়ের একটা সুবিধা আছে... বারান্দার জমাট অন্ধকারে কেউ চোখ দেখছে না…

(চলবে)

Copy Post - 

ছবি/সংযুক্তি


ক্রম


Share with :

Facebook Twitter